সপ্তাহখানেক
আগে দুর্দান্ত একটা ভ্রমন সেরে এসেছি। অভিজ্ঞতা শেয়ার করার একটা তাগিদ অনুভব করছিলাম।
সে সাথে যুক্ত হয়েছে আমার পাঠকদের অনুযোগ। লেখি না অনেকদিন।
ভ্রমন আমার
নেশা। সরকারী কাজে বিদেশ ভ্রমনে পানি খেয়ে থে'কে পয়সা জমিয়েছি পৃথিবী ঘুরবো বলে। ইতিমধ্যে
একটা টপটেন চার্ট করেছি যা দেখে মরতে চাই। এই লিস্ট আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করবো আরেকদিন।
আজ চলুন দেজাভ্যু (Déjà vu) ঘুরে আসি।
Déjà vu একটি
ফ্রেঞ্চ শব্দ। এর অনেক spiritual অর্থ থাকলেও আজকের লেখায় আমি Déjà vu বলতে “স্বপ্নের
দেশ”কে বোঝাবো।
Camp
Inani ’র সাথে আমার পাঠকবৃন্দ খানিকটা পরিচিত। এটা কক্সবাজারের (তথা বাংলাদেশের) একমাত্র
জায়গা যেটা সীবীচ-পাহাড়-জংগল-নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। সবাই এখানে এসে জাগতিক আরাম আয়েশ (মানে এয়ারকন্ডিশন বা গীজার) খুজলেও আদতে এটা শুধুমাত্র
একটা adventure ক্যাম্পসাইট যা নদীসম খালের পাড়ে অবস্থিত।এখানে রাত্রীযাপন করতে করতেই
গুগল ম্যাপে দেখছিলাম এই খালের উৎস কোথায়। লিভিংস্টোন, স্ট্যানলী’র মতো নীলনদের উৎস খোজা মানুষদের জীবনী পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি একসকালে
বেড়িয়ে পড়লাম ইনানী খালের উৎসের সন্ধানে। সাথে গাইড। সিকিউরিটি, দুজন সহযাত্রী আর বিশ্বস্থ
সহচর বাগবাই।
এলাকাটা একদম
গহীন ও জনমানববিহীন। তবে এর চেয়েও ভয়ের বিষয়টি হলো এখানে ১২-১৩টা বন্যহাতির একটা পালের বিচরনভুমি। যেকোন মুহুর্তে তাদের সাথে মোলাকাত
হতে পারে অথবা বেশী শব্দ করলে তারা জংগল থেকে বেড়িয়ে আমাদের দাবড়ানি দিতে পারে। এমন
পরিবেশে আমরা রওনা দিলাম চারিদিক উচুপাহাড়ের মাঝ দিয়ে এঁকে বেঁকে যাওয়া একটা খাল ধরে।
এমনিতে সকালের
ঠান্ডা ভাব, সমুদ্রের বাতাস আর অন্যদিকে সুর্যের আলোছায়া খেলায় শুরুটা ছিল অসাধারন।
মাঝে মাঝে সমুদ্রের গর্জনটা খুব প্রকট লাগছিল কারন ভুগঠন অনেকটা ফানেল টাইপ ছিল। খালের
স্বছ হাটু পানি ভেঙ্গে আমরা এগুতে থাকলাম পূর্বদিকে। সবার সামনে আমাদের বাগবাই। একটু
পরপর দুপাশের পাহাড়ে উঠে কিছু খোঁজার চেষ্টা করছিল। আবার নেমে এসে একদম গা ঘেঁষা। তবে
একবার সে একটু স্বাভাবিক আচরন করছিল আর আমরা ভাবছিলাম এইবার বুঝি আমরা পড়লাম হাতির
পাল্লায়।
পুরোটা পথ
(মানে খালটা) টায় শুনশান নিরবতা। আমরা মাঝে মাঝে থামছিলাম কখনো অচেনা লালফুল দেখে।
কখনো নাম না জানা পাখির ডাক শুনে। দু একটা জায়গায় শাখা খালের জংশন পয়েন্টে থমকে গিয়েছিলাম
শিরশির বাতাসের ছোঁয়া পেয়ে। আর পুরো পথ জুড়ে ছিল একদল হাতির পদচিহ্ন। হয়তো মিনিট দশেক
আগে তারা পারাপার করেছে। কিছুদুর পরপর হাতির তাজা মল। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল আমরা কি
ভুল সময় বা ভুল পথ বেছে নিয়েছি? ফিরতে পারবো তো?
এভাবে প্রায়
ছয় কিলোমিটার পার হবার পর ক্লান্ত আমরা হটাৎ করেই হাজির হলাম আমার স্বপ্নের দেশে।
Déjà vu। সমুদ্র-পাহাড়-জংগল-নদী ছেড়ে হটাৎ
পাওয়া এমন জায়গা আমাদের সবাইকে চমকে বাকহীন করে দিল। এতো সত্যিই স্বপ্নের দেশ।
প্রায় দুই
কিলোমিটার ব্যাসের একটা গোলাকার জায়গা। চারিদিকের পাহাড় ঘিরে থাকায় মনে হলো এটা পৃথিবী
থেকে বিচ্ছিন একটা জায়গা। পুরো এলাকাটা যেন একটা বিশাল এক প্রাকৃতিক এম্ফিথিয়েটার।
মাঝখানে পুর্ব-পশ্চিমে একটা খাল। আর তার চারপাশে বিভিন্ন স্তরে সেজে আছে একটা গ্যালারীর
মত সমতল ভুমি। অনেকটা ওয়েস্টার্নমুভির দৃশ্যপট। ধুধু মাঠের মাঝখান দিয়ে মনে হচ্ছিল
এই বুঝি ঘোড়া দাবড়িয়ে ছুটে আসবে “এরফান জেসাপ”। আরো দূরে পাতাবিহীন এক অচীন বৃক্ষ। মনে হয় এখানেই আউটল’দের ফাঁসিতে ঝুলানো হতো। আর খালের স্বচ্ছপানি দেখে মনে হচ্ছিল একপাল
গরু নিয়ে ঘরে ফিরবে কোন র্যাঞ্চমালিক।
পাঠক। জায়গাটার
সৌন্দর্য আমি আর বোঝাতে পারবো না। কারন আমি এখনো হ্যালুসিনিশনে আছি।
ভরা জোছনা
বা ঝুমবৃষ্টিতে জায়গাটা কেমন লাগবে?
রাতের আকাশে
কয়টা তারা গুনতে পারবো?
আমবশ্যায়
কি টের পাবো কখন হাতির পাল আমার পাশে এসে দাড়িয়েছে ?
ফিরতে ইচ্ছে
করছিলো না। তবু ফিরলাম প্রতিজ্ঞা করে। বারবার আসবো আমি এই জায়গায়। সময়ে অসময়ে।
নোটঃ
১। Déjà
vu’র কোন ছবি দিলাম না। পাহাড়-জংগল-নদীপথ পেরিয়ে এবং ক্লান্ত দেহে Déjà vu তে পৌছানোর
যে মিথস্ক্রিয়া তা কখনো ছবি দিয়ে প্রকাশ করা যাবে না।
২। ফেরার
রাস্তাটা ছিল ভীষন কষ্টের। তবে আমাদের ছবি দেখে কেউ বলবে না আমরা কষ্ট পাচ্ছি। প্রচণ্ড
রৌদ্রের মাঝে ধুলিময় পথ পাড়িয়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার হেটে আমরা একটা বালুবহন-কারী ট্রাকের
সন্ধান পেয়েছিলাম। সেটাতে উঠে আমরা উখিয়া গিয়ে পরে ইনানীতে ফেরত এসেছি।
২। খালের
এক জায়গায় আমরা ট্রাকবাহী সদ্যনির্মিত রাস্তা দেখেছি। এটা স্রেফ কাঠচোরদের কাজ।
অনুরোধঃ
Déjà vu হোক
Camp Inani’র একটি আকর্ষন। কেউ একা বা আলাদা ভাবে যাবেন না প্লিজ। এতে যেমন সৌন্দর্য
হারিয়ে এলাকাটা পানির বোতল আর চিপসের প্যাকেটের ভাগাড় হবে তেমনি হাতি’র পালের সামনে পড়ে প্রানহানী’র আশংকা রয়েছে।নেটওয়ার্ক বিহীন এলাকায় পথ হারানোর সম্ভাবনা আছে প্রচুর।
রাত্রীযাপনের
প্ল্যান নিয়ে Déjà vu তে যান। আর সকল দায় দায়িত্ব ছেড়ে দিন Camp Inani’র হাতে।